Civil disobedience movement in India

Advertisements
  • আইন অমান্য আন্দোলন

১৯৩০-এর দশকে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই সংকটজনক হয়ে ওঠে। এই সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লাহাের ষড়যন্ত্র মামলা, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের পুনরাবির্ভাব, শ্রমিক আন্দোলন প্রভৃতি ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে তােলে।পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে অরাজকতা ও হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য গান্ধিজি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেন।

1.আইন অমান্য আন্দোলনের পটভূমিকা

ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানের উপায় হিসেবে গান্ধিজি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে জানুয়ারি ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় ১১ দফা দাবি’ প্রকাশ করেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই দাবিগুলাে অগ্রাহ্য করলে গান্ধিজি খুবই ক্ষুদ্ধ হন। এর ফল হিসেবে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই ফেব্রুয়ারি (গুজরাটের সবরমতী আশ্রমে
গান্ধিজির নেতৃত্বে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি আইন অমান্য আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহণ করে)। আইনঅমান্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি ছিল লবণ আইন, কর প্রদানের আইন প্রভৃতি বিভিন্ন সরকারি আইন অমান্য করা, সরকারি দপ্তর বর্জন করা, স্কুল কলেজ বর্জন করা প্রভৃতি ।

2. অসহযােগ আন্দোলনের সূচনা এবং গান্ধিজির ডান্ডি অভিযান :

আইন অমান্য আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা না মেনে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই মার্চ গান্ধিজি আমেদাবাদ থেকে ২০০ কিলােমিটার পরে গুজরাটের সমুদ্রোপকূলে অবস্থিত ডান্তিতে লবণ প্রস্তুত করেন, যা ডান্ডি শভিযান নামে খ্যাত।

ডান্ডি যাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্ব :

ডান্ডি যাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্ব হল : (১)গান্ধিজি দীর্ঘ পদযাত্রার মাধ্যমে ভারতে জনগণকে প্রভাবিত ও আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন। (2) লবণের মতাে নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিসকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু করায় সাধারণ মানুষ সহজেই এই আন্দোলনে সামিল হন।

3. বিস্তার:

লবণ আইন অমান্যকে কেন্দ্র করে গান্ধিজির পদযাত্রা সারা ভারতে ব্যাপক চাঞল্যের সৃষ্টি করে। শীঘ্রই এই আন্দোলন কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই প্রভৃতি বড়াে বড়াে শহরসহ গুজরাট, বাংলা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে গুজরাটের ধরসানা ও ওয়ালডার অঞলে গান্ধিজি স্বয়ং উপস্থিত থেকে আইন অমান্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্দোলন পরিচালনার অভিযােগে সরােজিনী নাইডু ও আব্বা তায়েবজি গ্রেপ্তার হন। বাংলার কাথি ও তমলুক মহকুমাসহ মেদিনীপুরের বিভিন্ন আঞ্ছলে বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, কুমার চন্দ্র জানা, ডাঃ সুরেশ চন্দ্র জানা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। 

4. মুসলিম সমাজের ভূমিকা :

আইন অমান্য আন্দোলনে মুসলিম সমাজের ভূমিকা ছিল নগণ্য অবশ্য মৌলানা আজাদ, ডঃ আনসারী প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। গান্ধিজির মন্ত্রশিষ্য খান আব্দুল গফফর খাঁ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পাঠান উপজাতিদের সংঘবদ্ধ করে খােদাই খিদমতগার’ বা লাল কোর্তা বাহিনী গঠন করেন। পরবর্তীকালে তিনি সীমান্তগান্ধী’ নামে খ্যাতি লাভ করেন।

5. সরকারি প্রতিক্রিয়া :

আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা থেকেই সরকারি মহল নির্মম দমন নীতির আশ্রয় নেয়। গান্ধিজি ও অন্যান্য নেতাসহ প্রায় নব্বই হাজার সত্যাগ্রহী গ্রেপ্তার হন। কংগ্রেসকে বে-আইনী বলে ঘােষণা করা হয়। মহারাষ্ট্রে আন্দোলন দমন করার জন্য সেনা নামানাে হয়। এছাড়া ৫৫টি ছাপাখানা ও ৬৭টি সংবাদ পত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এইভাবে ব্রিটিশ সরকারের  নির্মম দমন নীতির চাপে আইন অমান্য আন্দোলনের গতি ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে আসে।

6.গান্ধি-আরউইন চুক্তি (১৯৩১ খ্রিঃ)

আইন অমান্য আন্দোলন কালে প্রথম গােলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হলে ব্রিটিশ সরকার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে এক আপােস রফায় আসতে উদ্যোগী হয় শুরু হয় গান্ধিজি ও বড়লাট আরউইনের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলােচনা। শেষ পর্যন্ত ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ৫ই মার্চ গান্ধি-আরউইন চুক্তি (Gandhi-Irwin Pact) সম্পাদিত হয় এই চুক্তি অনুসারে গান্ধিজি দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে (সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ খ্রিঃ) কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসাবে যােগদান করেন। কিন্তু নানা কারণে দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হয়ে গেলে গান্ধিজি শূন্য হাতে ভারতে ফিরে আসেন এবং আবার আন্দোলন শুরু করেন, কিন্তু ব্রিটিশের দমন ও বিভেদ- নীতির ফলে আইন-অমান্য আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে গান্ধিজি আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের নির্দেশ দেন।

 7. সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা :

একদিকে যখন আইন অমান্য আন্দোলন ভারতের জাতীয় রাজনীতিকে  উদ্বেলিত করে তুলেছিল, তখন অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার লন্ডনে গােলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার ভারতে ধর্ম ও বর্ণগত বিভেদকে প্ররােচিত করার জন্য ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডােনাল্ড সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি (Communal Award) ঘােষণা করলেন। এই নীতি অনুসারে মুসলিম, শিখ, ভারতীয় খ্রিস্টান, অ্যাংলাে ইন্ডিয়ান প্রভৃতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আইনসভায় পৃথক নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হয়। এমনকি হিন্দু সমাজের অঙ্গীভূত অনুন্নত বা তফশিলী সম্প্রদায়কে পৃথক নির্বাচনের অধিকার দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সরকারের এই ধরনের বিভেদনীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেস প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তােলে।

8. পুণা চুক্তি (১৯৩২ খ্রিঃ) :

১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডােনাল্ড যে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি ঘােষণা করেন তা ছিল ভারতবাসীর মধ্যে জাতি, ধর্ম ও বর্ণগত প্রভেদকে বাড়িয়ে তোলার একটি অপকৌশল। ভারতীয় জনগণকে ভুল বােঝানাের জন্য ব্রিটিশ সরকারের এহেন সাম্প্রদায়িক বিভেদ- নীতির বিরুদ্ধে গান্ধিজি ২০শে সেপ্টেম্বর (১৯৩২ খ্রিঃ) আমরণ অনশন শুরু করলেন।

এই  অনশনের ফলে গান্ধিজির জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করলেন এবং তাঁদের দু’জনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। ‘পুণা চুক্তি’নামে পরিচিত এই চুক্তি অনুসারে অনুন্নতসম্প্রদায়ের জন্য পৃথক-নির্বাচনের ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং হিন্দুদের যৌথ নির্বাচনের সূত্র মেনে নেওয়া হয়। তবে, অনুন্নত শ্রেণির আসন সংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় (এই আসনগুলি তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল)। পুণা চুক্তি গান্ধিজির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে এবং তার প্রচেষ্টায় হিন্দু সমাজের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অপচেষ্টা ব্যর্থ হয় যায় ….

ইতিহাস এর আরো নোটস স্টাডি মেটেরিয়ালস পেতে আমাদের উপরের মেনু টে History(ইতিহাস) পেজ টি ওপেন করুন”……….
গুরুকুল ফান্ডা
Share the post
Advertisements

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisements
Button
WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now