Subject Notes

সিন্ধু সভ্যতা

Advertisements

সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল ছিল ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত

  • 1924 সালে স্যার জন মার্শালের একটি বিবৃতি থেকে জানতে পারা যায় যে তাঁর ভারতীয় সহকর্মীগণ বিশেষত রাখাল দাসবন্দোপাধ্যায় (১৯২২-২৩) সালে মহেঞ্জোদাড়োতে (পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায়) বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির একটি ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন।
  • 1921 সালে মহেঞ্জোদাড়োর কয়েক শত মাইল উত্তরে হরপ্পায়(বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মন্টোগোমোরি জেলায় আবিষ্কৃত হয় সিন্ধু সভ্যতার প্রথম কেন্দ্র (আবিষ্কারক দয়ারাম সাহানি)।
  • সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি কেবলমাত্র সিন্ধু নদের অববাহিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল দক্ষিণ বালুচিস্তানের সুটকাগানডর পর্যন্ত এবং পূর্বে উত্তর প্রদেশের আলমগিরপুর পর্যন্ত।
  • সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কারের পূর্বে ঐতিহাসিকদের ধারনা ছিল ভারতের মাটিতে সভ্যতার সূচনা করেছিলেন বহিরাগত আর্যগণ। সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র ছিল সিন্ধু প্রদেশ এবং পাঞ্জাব এবং সেখান থেকে চতুর্দিকে বিস্তৃতি লাভ করেছিল এই সভ্যতা।

•সিন্ধু এবং পাঞ্জাবে সভ্যতার মূল কেন্দ্রস্থল ছিল এবং এখান থেকে সব জায়গায় তার বিস্তৃতি ছড়িয়েছিল।

  • বিশ্বের প্রাচীনতম চারটে সভ্যতার (মিশর, মেসোপটেমিয়া,দক্ষিণ এশিয়া এবং চীনের) মধ্যে সবথেকে বৃহত্তম সিন্ধ সভ্যতা, আয়তনে 1.3 মিলিয়ন বর্গ কিমি বিস্তৃত ছিল এবং
    আকৃতি ছিল ত্রিভুজাকার।

ভৌগোলিক বিস্তৃতি

  • এর পশ্চিমতম বিন্দু ছিল সুটকাগান ডর অবস্থিত ছিল দক্ষিণ বালুচিস্তানে এবং পূর্বতম বিন্দু ছিল আলামগিরপুর অবস্থিত
    ছিল উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলায়।
  • এটি উত্তরে বিস্তৃত ছিল আফগানিস্তান পর্যন্ত এবং দক্ষিণে বিস্তৃত ছিল মহারাষ্ট্র রাজ্য অবধি।
  • সিন্ধুর কিছুটা জায়গা বালুচিস্তান,আফগানিস্তান, পশ্চিম পাঞ্জাব, পাঞ্জাব, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান,জম্মু ও কাশ্মীর এবং মহারাষ্ট্রে এই সভ্যতা বিস্তৃতি ঘটিয়েছে।
  • মুন্ডিগাক এবং শোরতুগাই দুটি কেন্দ্র আফগানিস্তানে অবস্থিত।

নগর পরিকল্পনা (Town Planning)

  • সিন্ধু সভ্যতার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর নগরায়ন এবং নগর পরিকল্পনা। মহেঞ্জোদাড়ো, হরপ্পা, লোথাল এবং
    সুটকাগান ডর নগর পরিকল্পনা ছিল একই প্রকৃতির।
  • নগরের পশ্চিমাংশে অধিকতর উচ্চতায় অবস্থিত সিটাডেল নির্দেশ করে সমাজে উচ্চতর শ্রেণীর অস্তিত্ব। প্রাচীরবেষ্টিত সিটাডেলে ছিল প্রশাসনিক ভবনগুলি। সিটাডেলের নীচে বাকি অংশে ছিল মূল নগর। সর্বত্র, মুখ্য সড়কগুলি বিস্তৃত ছিল উত্তর থেকে দক্ষিণে অন্য সড়ক গুলি মুখ্য সড়ক গুলিকে ছেদ করেছিল সমকোনে।
  • আবাস গৃহ এবং অন্যান্য বাড়িগুলি অবস্থিত ছিল রাস্তার দু ধারে। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদাড়োর বাড়িগুলি তৈরী হয়েছিল ইট ভাঁটায় পোড়ানো ইঁটে। রোদে পোড়ানো ইটে তৈরী বাড়ি পাওয়া গেছে লোথাল এবং কালিবঙ্গানে। সাধারন বাড়িগুলিতে রান্নাঘর ও স্নানঘর মিলিয়ে ছিল চার থেকে ছটি থাকার ঘর। সিঁড়িওয়ালা দুতলা ও তিনতলা বাড়িগুলিতে ছিল তিরিশটা পর্যন্ত থাকার ঘর।
  • প্রতিটি বাড়িতে ছিল কূপ এবং জল নিকাশী ব্যবস্থা যার মাধ্যমে গৃহের ময়লা জল গিয়ে পড়তো শহরের ভূগর্ভস্থ জল নিকাশী নালিতে। সুপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ জল নিকাশী ব্যবস্থা সিন্ধু সভ্যতার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা তাকে সমকালীন অন্য তাম্র ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতাগুলি থেকে পৃথক করে। রাস্তাগুলির তলায় ছিল ভূগর্ভস্থ নিকাশী নালি। প্রত্যেকটি বাড়িতে ছিল অনুভূমিক এবং উলম্ব নালিগুলি ঢাকা থাকত প্রস্তরখন্ড দ্বারা। বাড়ির নালিগুলি সামনের রাস্তার ভূগর্ভস্থ নালির সাথে সংযুক্ত থাকত। মহেঞ্জোদাড়োর বৃহত্তম স্নানাগার এটি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ছাড়াও স্নানের জন্য ব্যবহৃত হত। স্নানাগারে দু পাশে ছিল জলে নামার সিঁড়ি। স্নানাগারের পাশে ছিল স্নানের পরে বেশভূষা পরিবর্তনের জন্য ছোট ছোট ঘর।

সমাজ ব্যবস্থা :

এই সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের পরিযায়ী, যারা ভাষাগত দিক থেকে দ্রাবিড়ীয়। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রোটো অ্যাস্ট্রোলয়েড (নৃত্যরত মহিলা), মঙ্গলয়েড (প্রিষ্ট হেড) এবং অ্যালপাইনস্ প্রভৃতি।সমাজে গরীবদের তুলনায় ধনীদের আধিপত্য বেশি ছিল।এটা তাদের ঘরবাড়ি ও তাদের মৃতদেহ সৎকারের ধরণ দেখে জানা যায়। প্রথম থেকেই মহিলাতান্ত্রিক সমাজ ছিল। ঈশ্বরকেদেবী রূপে পূজা করা হত।

  • খাদ্যাভ্যাস : তাদের মধ্যে নিরামিষ ও আমিষ উভয় খাদ্যাভ্যাসই প্রচলিত ছিল। তাদেঁর প্রধান খাদ্য ছিল গম এবং বার্লি। তারা ভাত খুব কমই খেত এবং তাদের দুগ্ধজাত পণ্যের জ্ঞান ছিল।.
  • পোষাকের ধারণা : নারী ও পুরুষ উভয়ই সুতি ও উলের তৈরী দুই ধরনের জামা কাপড় পরিধান করত। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কেশ শৈলীর নিদর্শন পাওয়া গেছে। তারা খুবই সৌন্দর্য সচেতন ছিল। তারা চুড়ি, কানের দুল, হাতের বালা, আংটি, কাজল, আয়না, লিপস্টিক প্রভৃতি প্রসাধনী দ্রব্য ও অলঙ্কার ব্যবহার করত।
  • বিনোদন : লুডো খেলা, নাচ, গান, পশু শিকার প্রভৃতি ছিল তাদের বিনোদনের প্রধান উপকরণ। শিশুরা প্রধানত টেরাকোটার খেলনা নিয়ে খেলত, যথা—গরুর গাড়ি।
  • শিক্ষা ব্যবস্থা : হরপ্পার মানুষেরা সিন্ধুর চিত্রদ্বারা লিখন পদ্ধতির (Pictographic Sect.) দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ করত। বুস্ট্রোফেডন লিপি, তাদের সিলমোহর, মাটির পাত্র এবং সাইনবোর্ডে পাওয়া গেছে।
  • কৃষিকাজ : হরপ্পার অর্থনীতি প্রধানত কৃষিকাজ নির্ভর।প্লাবনভূমিতে তারা বছরে দুই বার চাষবাস করে। গম ও বার্লি হল শীত প্রধান শস্য। তুলো, জোয়ার, তিল, সরষে, ফল ও সবজী হল গ্রীষ্মকালীন ফসল। বনওয়ালিতে উচ্চ গুণমানের বার্লি উৎপন্ন হত।
  • জলসেচ : বালুচিস্তানে জল সংরক্ষণ করার জন্য গার্বব্যান্ডস্(পাথরের বাঁধ) ব্যবহৃত হত। কিন্তু খালের মাধ্যমে জলসেচ ব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া যায় নি। তাই এখানে বৃহৎ মাত্রায় ধান উৎপাদনের কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নি। কিন্তু লোথাল ও কালিবঙ্গানে প্রচুর পরিমাণে ধান উৎপন্ন হত।
  • গবাদি পশু প্রতিপালন : পশুপালন ছিল তাদের একটি গৌণ কাজ। বাছুর, শূকর, উট, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতি তারা প্রতিপালন করত। কালিবঙ্গানে উঠের হাড় এবং সুরকোটাডায় ঘোড়ার হাড় পাওয়া গেছে। গোরুর কোন চিহ্ন পাওয়া যায় নি, কিন্তু ষাঁড়/কুঁজ যুক্ত ষাঁড় পাওয়া গেছে।
  • হস্ত শিল্প : পুঁতির মালা তৈরী, ধাতব জিনিষ, জাহাজ তৈরী, সিলমোহর, পাথরের স্থাপত্য, মাটির কাজ এবং টেরাকোটার শিল্প সিন্ধু সভ্যতায় বিশেষভাবে পরিগণিত হয়।
    ■ পুঁতি তৈরী শিল্প : লোথাল, ধোলাভীরা এবং চানহুদারো।
    ■ ধাতব জিনিস তৈরী শিল্প : লোথাল, ধোলাভীরা এবং সুক্কুর।
    ■ স্মৃতিবস্ত্র : মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা এবং চানহুদারো।
  • ব্যবসা ও বাণিজ্য : কৃষিকাজ এবং শিল্পের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে সিন্ধু সভ্যতার মানুষজন আঞ্চলিক বাণিজ্য, আন্তঃর্জাতিক বাণিজ্য যেমন—মেসোপটেমিয়া, পার্সিয়া, আরব এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যে বিনিয়োগ শুরু করে। নব্য প্রস্তর যুগের বুর্জাহোম এবং তেক্কালাকোটায় বাঁশ ও সোনা রপ্তানি করা হয়। অপরদিকে গণেশ্বর-যোধপুর এবং আহার-বানাস থেকে হরপ্পার লোকেরা তামা আমদানি করত।
Advertisements
Advertisements
Button
WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now