Subject Notes

ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও মহাত্মা গান্ধী

Advertisements

মহাত্মা গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮) :

১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে ২ অক্টোবর গান্ধীর জন্ম গুজরাটের পােরবন্দরে । ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ব্যারিস্টারী পাশ করেন। তিনি রাজকোট ও বােম্বাইয়ে আইন ব্যবসায়ে ব্যর্থ হন। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে দাদা আবদুল্লা এ্যান্ড কোং-এর মামলা লড়তে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। দক্ষিণ আফ্রিকায় পিটার মারিটসবার্গ স্টেশনে ট্রেন থেকে গান্ধীকে জোর করে নামিয়ে দেওয়া হয়। ডেভিড থেরাের ‘সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’ (Civil Disobedience), লিও টলস্টয়ের ‘কিংডম অফ গড’ এবং জন রাসকিনের ‘আন টু দি লাস্ট’ বইগুলি তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ডারবানে তিনি ফোনেক্স ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নাটালে টলস্টয় ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ান’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে গান্ধী- স্মট চুক্তি হয়। তিনি নাটালে নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস স্থাপন করেন। লর্ড হার্ডিঞ্জ গান্ধীজির কার্যকলাপ পর্যালােচনার জন্য গােখলেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠান। গােখলের অনুরােধে গান্ধী লন্ডন হয়ে ভারতে ফিরে আসেন ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। গােখলেকে তিনি রাজনৈতিক গুরু এবং টলস্টয়কে তিনি আধ্যাত্মিক গুরু মানতেন। গান্ধীর পিতা ছিলেন কাবা গান্ধী ও মাতা ছিলেন পুতলিবাঈ।। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ৪৬ বছর বয়স্ক গান্ধীজি গুরু গােপালকৃষ্ণ গােখলের পরামর্শে ভারতের বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণ করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সবরমতী আশ্রম স্থাপন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশকে সাহায্যের জন্য কাইজার-ই-হিন্দ স্বর্ণপদক পান। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি চম্পারণে ভারতের প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। নীলকরেরা, স্থানীয় কৃষকদের ৩/ ২০ অংশ জমিতে নীল চাষে বাধ্য করত। একে বলা হত তিনকাঠিয়া ব্যবস্থা। রাজকুমার শুক্লা গান্ধীজিকে চম্পারণে যেতে আহ্বান করেন। গান্ধীজির সঙ্গে এই আন্দোলনে ছিলেন ব্রজকিশাের, রাজেন্দ্র প্রসাদ, গান্ধীজির ব্যক্তিগত সচিব মহাদেব দেশাই, নরহরি পারেখ, জে. বি. কৃপলনী, এ. এন. সিনহা এবং গােরক্ষ প্রসাদ। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে চম্পারণ কৃষিবিল পাশ হয়। এতে তিনকাঠিয়া ব্যবস্থা বিলােপ করা হয়। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজি গুজরাটের খেড়ায় আন্দোলন করেন। এই আন্দোলনে গান্ধীজির সঙ্গে ছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল, ইন্দুলাল যাজ্ঞিক, ব. বি. প্যাটেল, এ. সারাভাই।  ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজি আমেদাবাদে মিল শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। গান্ধীজির সঙ্গে ছিলেন অনসূয়া বেন আন্দোলনের চতুর্থ দিনে মিল কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন ৩৫% বাড়িয়ে দেন।

রাওলাট আইন :

১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বিচারপতি রাওলাটের নেতৃত্বে রাওলাট কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সদস্যরা ছিলেন স্যার বাশিল স্কট, স্যার ভারনি লােভেট, সি. ভি. কুমার স্বামী শাস্ত্রী এবং প্রভাস চন্দ্র মিত্র। রাওলাট কমিটি সিডিশন কমিটি নামেও পরিচিত ছিল।‘১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে এই কমিটি রিপাের্ট পেশ করে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি বিলটি কেন্দ্রীয় আইনসভায় তােলা হয়। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ বিলটি আইনে পরিণত হয়। রাওলাট আইনকে কালা আইন আখ্যা দিয়ে গান্ধীজি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ৬ এপ্রিল সারা ভারতে হরতালের ডাক দেন। এটিই ভারতবর্ষে প্রথম সর্বভারতীয় ধর্মঘট। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল গান্ধীজিকে দিল্লি পালওয়াল স্টেশনের কাছে গ্রেপ্তার করা হয়।

জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড :

১০ এপ্রিল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের দুই নেতা ড. সত্যপাল ও সঈফুদ্দিন কিচলুকে গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে অজ্ঞাতস্থানে রাখা হয় এবং গান্ধীজিকে গ্রেপ্তার করা হলে জনগণ উন্মত্ত হয়ে ওঠে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৩ এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে জনগণ বৈশাখী মেলা উপলক্ষে সমবেত হয়। অমৃতসরের বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আর. ডায়ার সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে ১০ মিনিট ধরে ১৬০০ রাউন্ড গুলি চালান প্রায় ১০ হাজার মানুষের ওপর। সরকারি মতে ৩৭৯ জন মারা যান ও ১২০০ জন আহত হন। সামরিক শাসনকর্তা ও ডায়ার অমৃতসরে সান্ধ্য আইন জারি করেন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে উধম সিং জেনারেল ডায়ারকে হত্যা করেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজদের দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ করেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের তদন্তের জন্য সরকার হান্টার কমিশন বসান। কংগ্রেসের তরফ থেকে অনুসন্ধানের জন্য চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে একটি কমিটি নিয়ােগ করা হয়। এই কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন গান্ধী, মতিলাল নেহেরু, জয়াকার ও আবৃাস তায়েবজি।

খিলাফত আন্দোলন :

তুরস্কের সুলতান খলিফা ছিলেন মুসলিম জগতের ধর্মগুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক জার্মানির পক্ষে যােগ দেয়। যুদ্ধের শেষে তুরস্কের সঙ্গে সেভর-এর সন্ধি হয়। তুরস্ক সাম্রাজ্যের কিছু অংশ ইংরেজ ও ফরাসীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয় এবং খলিফার মর্যাদা খর্ব করা হয়। খলিফার সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় মুসলমানেরা খিলাফত আন্দোলন শুরু করেন। মহম্মদ আলি, সওকত
আলি, মৌলনা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খাঁ, হজরত মােহানি প্রভৃতি মুসলমান নেতৃবৃন্দ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে অল ইন্ডিয়া খিলাফত কনফারেন্স প্রতিষ্ঠিত হয় এপ্রিল মে মাসে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্ণৌয়ে অল ইন্ডিয়া খিলাফত কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শেঠ চোট্টানি ছিলেন সভাপতি ও সওকত আলি ছিলেন সেক্রেটারি। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা অধিবেশনে খিলাফত কনফারেন্সের সভাপতি হন মৌলনা আবুল কালাম আজাদ। গান্ধীজি খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং কাইজার- ই হিন্দ স্বর্ণপদক ফেরত দিয়ে অসহযােগ আন্দোলন শুরু করেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই অল ইন্ডিয়া খিলাফত কনফারেন্স করাচি অধিবেশনে ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে মুসলমানদের পদত্যাগ করার দাবি করা হয়। ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে মুস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্বে তুরস্কে খলিফা পদেরব অবসান ঘটলে ভারতে খিলাফত আন্দোলনের প্রয়ােজনীয়তা শেষ হয়।

অসহযােগ আন্দোলন (১৯২০-২২)

১৯২০ খ্রিস্টাব্দে লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন বসে। গান্ধীজি অসহযােগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বরাজ অর্জনের জন্য একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। চিত্তরঞ্জন দাশ, মদন মােহন মালব্য, বিপিনচন্দ্র পাল, অ্যানি বেসান্ত, জিন্না গান্ধীজির এই প্রস্তাবের বিরােধিতা করেন কিন্তু মতিলাল নেহেরুর সহযােগিতায় গান্ধীজির প্রস্তাব পাশ হয়। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে নাগপুর অধিবেশনে অহিংস অসহযােগের প্রস্তাব পুনরায় গৃহীত হয়। কংগ্রেসের লক্ষ্য হিসাবে স্থির হয় স্বরাজ’, পন্থা হিসাবে স্থির হয় ‘অহিংস অসহযােগ’ ও নেতা হন গান্ধীজি। অসহযােগ আন্দোলনের কর্মসূচী হিসাবে সরকারি চাকরি, অনুষ্ঠান, খেতাব, আইনসভা ইত্যাদি বর্জন, অন্যদিকে গঠনমূলক কর্মসূচীর মধ্যে ছিল দেশীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সালিশি বাের্ড গঠন, মাদক বর্জন, চরকা ও খদ্দরের প্রচলন ইত্যাদি। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, কাশী বিদ্যাপীঠ, বিহার বিদ্যাপীঠ, গুজরাট বিদ্যাপীঠ, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল ইউনিভারসিটি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, মতিলাল নেহেরু, বিঠলভাই প্যাটেল, বল্লভভাই প্যাটেল, চক্রবর্তী রাজা গােপালাচারী প্রমুখ আইন ছেড়ে এই আন্দোলনে যােগ দেন। সুভাষচন্দ্র বসু আই. সি. এস. এর চাকরি ছেড়ে অসহযােগ আন্দোলনে যােগ দেন। তিলক স্বরাজ তহবিল গঠিত হয়, এই তহবিলে ১ কোটি টাকা জমা পড়ে। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রিন্স অফ ওয়েলস ভারতে এলে বােম্বাই ও কলকাতায় ধর্মঘট হয়। বাসন্তীদেবী, সরােজিনী নাইডু জ্যোতির্ময় গঙ্গোপাধ্যায়, উর্মিলা দেবী, হেমাপ্রভা মজুমদার প্রমুখ নারী এই আন্দোলনে যােগ দেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ৫ ফেব্রুয়ারি উত্তপ্রদেশের গােরক্ষপুর জেলার চৌরীচৌরা নামে দুটি গ্রামের উত্তেজিত জনতা ২২ জন পুলিশকে পুড়িয়ে মারে। অহিংস আন্দোলন সহিংস পথে গেলে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। ১০ মার্চ গান্ধীজিকে গ্রেপ্তার করে ৬ বছর কারাদন্ড ও জওহরলাল নেহেরুকে ১৮ মাসের কারাদন্ড দেওয়া হয়।

স্বরাজ্য দল :

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে গয়া কংগ্রেস অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহেরু, হাকিম আজমল খাঁ, বিঠল ভাই প্যাটেল, মালব্য, শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার, কেলকার, জয়াকার, সত্যমূর্তি প্রমুখ পরিবর্তনের সমর্থক (Pro changer) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ও আইনসভায় প্রবেশের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে বল্লভভাই প্যাটেল, রাজেন্দ্র প্রসাদ, ড. আনসারি, চক্রবর্তী রাজাগােপালাচারী প্রমুখ ছিলেন পরিবর্তনের বিরােধী (No Changer)। তাঁরা সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবর্তনের সমর্থকেরা ভােট পায় ৮৯০টি বিরােধিরা পায় ১৭৪০টি। মতিলাল নেহেরু ও চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ১ জানুয়ারী স্বরাজ্য দল গঠন করেন চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন সভাপতি ও মতিলাল নেহেরু ছিলেন সাধারণ সম্পাদক।  ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনে ৬২ লক্ষ লােক অংশ নেয়। কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১০১টি আসনের মধ্যে স্বরাজ্য দল পায় ৪২টি আসন। বােম্বাই, যুক্ত প্রদেশ ও আসামে, এই দল সাফল্য পায়। বাংলা এবং মধ্যপ্রদেশে এই দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বিঠলভাই প্যাটেল কেন্দ্রীয় আইনসভার সভাপতি বা স্পিকার নির্বাচিত হন। স্বরাজ্য দল মুসলমান সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হয়ে জাতীয়তাবাদী দল বা Nationalist Party গঠন করেন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে বাংলার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, মাদ্রাজে শেষাগ্ৰী আইয়ার, বম্বের পরাঞ্জপে, উত্তর প্রদেশের চিন্তামণি, এইচ. কুঞ্জরু প্রমুখ নেতা পরাস্ত হন। চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতার মেয়র নির্বাচিত হন ও সুভাষচন্দ্র বসু মুখ্যকার্যনিবাহী অফিসার নির্বাচিত হন। বল্লভভাই প্যাটেল আমেদাবাদ কর্পোরেশনের, জহরলাল নেহেরু এলাহাবাদ কর্পোরেশনের, রাজেন্দ্র প্রসাদ পাটনা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। স্বরাজ্য দল ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্ডার মুদিম্যান কমিটি ও লি কমিশনের রিপাের্টের প্রতিবাদ করে। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু হয়। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে স্বরাজ্য দল তিনভাগে ভাগ হয় যথা- পুরানাে স্বরাজ্য দল, রেসপনসিভিস্ট (Responsive), ইন্ডিপেনডেন্ট কংগ্রেস পার্টি। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনে ১০৪ আসনের মধ্যে স্বরাজ্য দল পায় ৪০টি আসন। বাংলায় তারা অধিকাংশ আসন পায়। বিহার ও উড়িষ্যাতে রেসপনসিভিস্টরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল , মধ্যপ্রদেশ পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশে স্বরাজ্য দল হেরে যায়।

সাইমন কমিশন :

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের শাসনব্যবস্থা পর্যালােচনা করতে সাইমন কমিশন নিযুক্ত হয় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিশনে কোনাে ভারতীয় সদস্য ছিল না। এ জন্য একে অল হােয়াইট কমিশন বলা হয়। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা  ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশন বােম্বাই আসে। মুসলিম লিগের সভাপতি মহম্মদ ইয়াকুব সাইমন কমিশন বয়কট করেন। মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা এবং লিবারেল ফেডারেশন সাইমন কমিশন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বােম্বাইয়ে সাইমন ফিরে যাও’ ধ্বনি ওঠে। লালা লাজপত রায় কমিশন-বিরােধী মিছিল পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে প্রহৃত হন। জওহরলাল নেহেরু ও গােবিন্দবল্লভ পন্থ পুলিশের হাতে প্রহৃত হন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারি কমিশন তার রিপাের্ট পেশ করে। এই রিপাের্টের ভিত্তিতে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইন রচিত হয়।

কংগ্রেসের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি:

  ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতসচিব বার্কেনহেড সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে ভারতীয়দের যােগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তােলেন। এর জবাবে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর জাতীয় কংগ্রেসের মাদ্রাজ অধিবেশনে সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহেরু পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করেন।১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ১২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে এম. এ. আনসারির  নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সাইমন কমিশনের বিরােধিতা করা হয়। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ মে বােম্বাই মিটিংয়ে  মতিলাল নেহেরুকে চেয়ারম্যান নিযুক্ত করে একটি কমিটি গঠিত হয়  ভারতের ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনা করতে। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট  মাসে সর্বদলীয় লক্ষ্ণৌ সম্মেলনের অধিবেশনে মতিলাল নেহেরু সংবিধানের খসড়াটি পেশ করেন। এটি নেহেরু রিপাের্ট নামে পরিচিত। মুসলিম লিগের নেতা মহম্মদ আলি জিন্না এবং হিন্দুমহাসভার নেতা এম. আর.জয়াকার এই রিপাের্টের বিরােধিতা করেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ মুসলিম লিগের দিল্লী অধিবেশনে মহম্মদ আলি জিন্নাহ নেহেরু রিপাের্টের পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ দফা দাবি পেশ করেন। নেহেরু রিপাের্টে ভারতের জন্য ডােমিনিয়ন স্ট্যাটাস দাবি করা হয়। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ৩১ অক্টোবর লর্ড আরউইন বলেন ভারতকে ঔপনিবেশিক স্বায়ত্বশাসন দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য কিন্তু উইনস্টন চার্চিল ভারতকে ডােমিনিয়ন-এর মর্যাদা দানকে এক গুরুতর অপরাধ বলে মনে করেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৩১ ডিসেম্বর লাহাের কংগ্রেস অধিবেশনে রাভি নদীর তীরে জওহরলাল নেহেরু কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। গান্ধীজি ৬ বছর কারাবাসের পরে আবার লাহাের কংগ্রেস অধিবেশনে যােগ দেন। কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সমিতি থেকে বামপন্থী সুভাষচন্দ্র বসু ও শ্রীনিবাস আয়েঙ্গারকে বাদ দেওয়া হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি কংগ্রেসের নবগঠিত কার্যনিবাহী সমিতির বৈঠকে স্থির হয় ২৬ জানুয়ারী স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালিত হবে।

আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-৩৪) 

আন্দোলন শুরুর পূর্বে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীজি সরকারের কাছে ৩০ দফা দাবি পেশ করেন । তার ইয়ং ইন্ডিয়া’ পত্রিকার মাধ্যমে গান্ধীজি লবণ আইন ভঙ্গের জন্য ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ ডান্ডি অভিযান করেন। গান্ধীজির সঙ্গে ৭৮ জন (মতান্তরে ৭৯) স্বেচ্ছাসেবী ২৪ দিনে ২৪১ মাইল পথ অতিক্রম করে ডান্ডি পৌছন। ৬ এপ্রিল গান্ধীজি স্বহস্তে লবণ তৈরী করে লবণ আইন ভঙ্গ করে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা করেন। আইন অমান্য আন্দোলন তামিলনাড়ুতে নেতৃত্ব দেন চক্রবর্তী রাজাগােপালাচারি, অন্ধ ও উড়িষ্যার গােপবন্ধু চৌধুরী (উৎকলমণি), বােম্বাইয়ে যমুনালাল বাজাজ, পাঞ্জাবে তারা সিং, উত্তর প্রদেশে কালকাপ্রসাদ, বিহারে রাজেন্দ্র প্রসাদ, মণিপুরে রাণী গুইডিলু, আসামে তরুণ রাম ফুকোন, এলাহাবাদে এম. এন. রায়, বাংলার যতীন্দ্রমােহন সেনগুপ্ত প্রমুখ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। মহিলাদের মধ্যে কমলা নেহেরু, স্বরূপরানি নেহেরু, সরােজিনী নাইডু, বাসন্তীদেবী, উর্মিলাদেবী, সরলাবালা দেবী, লীনা নাগ প্রমুখ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বিভিন্ন প্রদেশের চৌকিদারী কর, লবণকর, মাদকদ্রব্য ও ভূমিকর না দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানাে হয়। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন গান্ধীবাদী নেতা সীমান্তগান্ধী খান আবদুল গফফর খান তিনি খুদা- ই-খিদমদগার বা ঈশ্বরের সেবক দলের প্রতিষ্ঠা করেন। এই দলের সদস্যরা লাল পােশাক পরত বলে এদের লাল কুর্তা বলা হত। গান্ধীজি সুরাটজেলার ধরসানায় সরকারি লবণ গােলা দখলের সিদ্ধান্ত নিলে প্রথমে গান্ধীজিকে এবং তারপর আব্বাস তায়েবজিকে সরকার গ্রেফতার করলে সরােজিনী নাইডুর নেতৃত্বে অভিযান চালানাে হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ১ এপ্রিল বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল এবং ২৭ এপ্রিল ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের প্রেস অর্ডিন্যান্স পুনঃপ্রবর্তিত হয়।

গান্ধী আরউইন চুক্তি (১৯৩১) :

তেজবাহাদুর সপ্রু, ড. জয়াকার এবং অন্যান্যদের প্রচেষ্টায় ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ৫ মার্চ গান্ধী-আরউইন চুক্তি বা দিল্লী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসাবে গান্ধীজি ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে যেতে রাজি হন।

গােলটেবিল বৈঠকঃ

  প্রথম গােলটেবিল বৈঠক ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় ১২ নভেম্বর ১৯৩১।  ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৩১ অক্টোবর লর্ড আরউইন তার ঘােষণাপত্র জারি করেন। প্রথম গােলটেবিল বৈঠকের সভাপতি ছিলেন রামসে ম্যাকডােনাল্ড। ১৬ জন সদস্য ব্রিটিশ রাজনৈতিক পার্টি থেকে, ১৬ জন সদস্য ভারতীয় রাজ্য থেকে এবং ৫৭ জন সদস্য ব্রিটিশ ভারত থেকে প্রথম গােলটেবিল বৈঠকে যােগ দেন। মুসলিম লিগের হয়ে যােগ দেন মহম্মদ আলি, মহম্মদ সফী, জিন্না, আগা, খান এবং ফজলুল হক। হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে মুঞ্জে ও জয়াকার যােগ দেন। ইন্ডিয়ান লিবারাল ফেডারেশানের পক্ষ থেকে যােগ দেন তেজবাহাদুর সপ্রু, চিন্তামণি, শ্রীনিবাস শাস্ত্রী। শিখসম্প্রদায়ের পক্ষে যােগ দেন সর্দার উজ্জ্বল সিং। ডিপ্রেসড ক্লাসের পক্ষে যােগ দেন ড. বি. আর. আম্বেদকর। প্রথম গােলটেবিল বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ICS ও IPS পরীক্ষা ভারতবর্ষে নেওয়া হবে। সেনাবাহিনীকে ভারতীয়করণ করা হবে। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জন্য একজন মন্ত্রী নিয়ােগ করা হবে। ভারত থেকে ব্রহ্মদেশ আলাদা করা হবে। বােম্বাই থেকে সিন্ধু প্রদেশ আলাদা করা হবে। প্রদেশগুলােকে স্বশাসন দান করা হবে। দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠক ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনে। এই বৈঠকে আরাে ৩১ জন নতুন প্রতিনিধি যােগদান করেন। গান্ধীজি ৬ ডিসেম্বর লন্ডন ত্যাগ করেন ও ২৮ ডিসেম্বর শূন্য হাতে বােম্বাই ফিরে আসেন। এই বৈঠকে যােগদানকারীদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য নেতারা ছিলেন আম্বেদকর, স্প্রু, জয়াকার, সরােজিনী নাইডু, মালব্য প্রমুখ। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত লন্ডনে তৃতীয় গােলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস তৃতীয় গােলটেবিল বৈঠক বয়কট করে। শুধুমাত্র ৪৬জন প্রতিনিধি এই অধিবেশনে যােগ দেন। সেক্রেটারী অফ স্টেটস ছিলেন স্যামুয়েল হােড়। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হােয়াইট পেপার প্রকাশ করা হয় এবং হাউস অফ কমন্স-এ উত্থাপন করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনে এটি প্রকাশিত হয় ।

আইন অমান্য আন্দোলন দ্বিতীয় পর্যায়ঃ

দ্বিতীয় গােলটেবিল বৈঠকে গান্ধি-আরউইন চুক্তির শর্তাদি কার্যকরী না হওয়ায়, উত্তরপ্রদেশে খাজনা বন্ধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জওহরলাল নেহেরু ও পুরুষােত্তমদাস ট্যান্ডনকে কারারুদ্ধ করা হয়। উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে আবদুল গফফর খান-এর লাল কুর্তা বাহিনীকে বেআইনি ঘােষণা করা হয়। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি সরকার চারটি নতুন দমনমূলক অর্ডিন্যান্স জারি করেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে গান্ধীজিকে বন্দি করা হয়। সরকারের দমন নীতি বৃদ্ধি পায়। বিলেতের ইন্ডিয়া লীগ পরিচালিত ডেলিগেশান রিপাের্টে দমন নীতির দিকটি প্রকট হয়ে ওঠে।১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজির কারামুক্তির পর তিনি হরিজন আন্দোলনে মনােনিবেশ করেন। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বিহারে ভূমিকম্পের পর এই আন্দোলন চাপা পড়ে যায়। ৪ মে পাটনায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন অমান্য আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়।

কংগ্রেসে অন্তর্দ্বন্দ্ব

১৯৩৮ সালে হরিপরা কগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসু সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। তার ভাবনা-চিন্তা ও পরিকল্পনা দক্ষিণপন্থা বা গান্ধীপন্থীদের খুশি করতে পারে নি। তাই ১৯৩৯সালে সুভাষচন্দ্র যখন দ্বিতীয়বার কংগ্রেস সভাপতি পদে পুননির্বাচিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তখন কংগ্রেসে অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ফলে ত্রিপুরী কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচন নিয়ে সংকট দেখা দিল। গান্ধিজি সুভাষচন্দ্রকে সমর্থন করলেন না। তার মনােনীত প্রার্থী পটুভি সীতারামাইয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হল সুভাষচন্দ্রের। সুভাষচন্দ্র জয়লাভ লেন ১৫৮০-১৩৭৭ ভােটে। নিজের মনােনীত প্রার্থীর পরাজয়ে গান্ধিজী ক্ষোভে বিষণ্ণ মনে বলেন “আমার চেষ্টাতেই ড. পট্টভি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান নি। অতএব এই পরাজয় তার অপেক্ষা আমারই অধিক।”নির্বাচনের পর সমস্যা এমন জটিল হয়ে উঠল যে, সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করলেন। এরপর তিনি ‘ফর ওয়ার্ড ব্লক’ নামে একটা রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।

স্টেট পিউপিল স্ট্রাগল বা দেশীয় রাজ্যগুলির জনগণের আন্দোলন :

১৯৩০-এর দশকে দেশীয় রাজ্যগুলির মধ্যে জাতীয় আন্দোলন প্রসার লাভ করে এবং রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন করার লক্ষ্যে এবং জনপ্রিয় সরকার গড়ে তােলার উদ্দেশ্যে আন্দোলন শুরু করে। “All India States Peoples Conference” গড়ে ওঠে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন রাজ্যগুলির মধ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপের সমন্বয় সাধনের উদ্দেশ্যে। এইসব রাজ্যের জনগণের মধ্যে দ্বিতীয় অসহযােগ আন্দোলন গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক উন্মাদনা সৃষ্টি করে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস States People’s Struggle সমর্থন করে এবং দেশীয় রাজাদের কাছে আবেদন জানায় যাতে তারা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সূচনা করেন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সালে “All India States People’s Conference- এর সভাপতি হন জওহরলাল নেহেরু। এই আন্দোলন বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের জনগণের মধ্যে জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করেছিল।

ক্রীপ প্রস্তাব :

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটি পার্লহারবার আক্রমণ করে। মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে জাপানের যুদ্ধ প্রয়াস পরিস্থিতিকে জটিল করে তােলে এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে জাপান ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, ইন্দোনেশিয়া, ইন্দোচীন,মালয়, সিঙ্গাপুর এবং ব্রহ্মদেশ অধিকার করে নেয়। ভারতের উপর জাপানী আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দেয়। এই সময় ভারতে ব্রিটিশদের অবস্থা ছিল শােচনীয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল শােচনীয়। ভারতবাসীর সহযােগিতা ভিন্ন জাপানের আক্রমণ প্রতিহত করা ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। মিত্রপক্ষের মধ্যে এই ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে যে, ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থই ভারতের সমস্যা সমাধানের পক্ষে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ভারতকে অবিলম্বে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এবং ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এরূপ পরিস্থিতিতে ভারতের শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা দূর করার জন্য এবং জাপানী আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাবার আশায় ভারতবাসীর সহযােগিতা লাভ করার উদ্দেশ্যে স্যার স্ট্যাফোর্ড
ক্রীপকে একটি খসড়া প্রস্তাবসহ ভারতে পাঠান। ক্রীপস ছিলেন একজন খ্যাতনামা আইনজীবী এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি ব্যক্তিগতভাবে জওহরলাল নেহেরুর ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন।
স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রীপস্ ভারতে এসে ভাইসরয়ের কার্য নির্বাহক সমিতির কাছে ২৩শে মার্চ ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তার প্রস্তাব আলােচনা করেন এবং দুদিন ধরে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রস্তাবটি সর্বসাধারণের
অবগতির জন্য পত্র পত্রিকা প্রকাশের অনুমতি দেন। এই প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয় যে—(১) আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের জন্যে শীঘ্রই ভারতীয় ইউনিয়ন গঠন করা হবে এবং সেটিকে ডােমিনিয়নের মর্যাদা
দেওয়া হবে। এই ডােমিনিয়ন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অপরাপর ডােমিনিয়নের সমমর্যাদা লাভ করবে। (২) যুদ্ধাবসানে ভারতীয় প্রতিনিধিগণকে নিয়ে একটি সংবিধানসভা গঠন করা হবে। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এই
সংবিধানসভা চুক্তিবদ্ধ হবে এবং সে চুক্তি অনুসারে ভারতীয়দের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করা হবে। তা ভিন্ন এ চুক্তিতে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় ও অন্যান্য বিষয়ের সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি থাকবে। (৩) ভারতের কোন প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য নতুন শাসনতন্ত্র গ্রহণে অস্বীকৃত হলে সে প্রদেশ বা দেশীয় রাজ্য নিজস্ব শাসনতন্ত্র রচনা করবে। (৪) সংবিধান সভার সদস্যগণ প্রাদেশিক আইনসভা, কর্তৃক নির্বাচিত হবেন। (৫) ভাইসরয়ের কার্যনির্বাহক পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভাইসরয়ের ভিটো ক্ষমতা প্রয়ােগের অধিকার থাকবে।

ক্রীপ প্রস্তাবের ব্যার্থতার কারণগুলি হল—

(১) প্রস্তাবে ভারতকে স্বাধীনতাদানের কোন উল্লেখ ছিল না। (২) ভারতের প্রতিরক্ষা পূর্ণ দায়িত্ব ভারতীয়দের হাতে দেবার কোন ইচ্ছাই ব্রিটিশ সরকার প্রকাশ করেনি। (৩) প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারকে ক্যাবিনেটের সমমর্যাদা দান ও ক্ষমতাদানের কোন প্রতিশ্রুতি ছিল না ভারতের জাতীয় কংগ্রেস উপরিউক্ত কারণে ক্রীপস্ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। জাতীয় কংগ্রেস দৃঢ়তার সঙ্গে জানায় যে—কেবলমাত্র মৌখিকভাবে প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে পূর্ণ সহযােগিতা করা সম্ভবপর নয়। মুসলীম লীগ পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবীকে অধিকতর গুরুত্ব জ্ঞাপন করে এবং প্রস্তাবকে অবাঞ্ছিত বলে ঘােষণা করে। হিন্দু মহাসভা এই প্রস্তাবে দেশ বিভাগের সম্ভাবনা দেখতে পায় এবং সেই কারণে প্রত্যাখ্যান করে। শিখ সম্প্রদায় এবং আম্বেদকরের পরিচালনাধীন হরিজন সম্প্রদায় ক্রীপস্ প্রস্তাবকে অযােগ্য বলে ঘােষণা করে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে ব্যর্থ হন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চাচিলের নির্দেশে আলাপ-আলােচনা বন্ধ করে দিয়ে মি. ক্রীগস্ স্বদেশে ফিরে যান। গান্ধীজী ক্রীপস্ প্রভাব সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন যে—এটি একটি পতনশীল ব্যাঙ্কের ওপর ভবিষ্যৎ তারিখে একটি চেকের সামিল। (” post-dated cheque on a crashing bank”).

আগস্ট আন্দোলন বা ভাৱতছাড়া আন্দোলন

১৯৩৯  সালে ৩ রা সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে ভারতসরকার ভারতকে যুদ্ধরত দেশ ঘােষণা করে। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে রামগড় অধিবেশনে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৮ আগস্ট বড়লাট লিনলিথগাে ঘােষণা করেন যে—(১) যুদ্ধান্তে ভারতকে ডােমিনিয়ানে মর্যাদা দেওয়া হবে। (২) বড়লাটের কার্যনির্বাহী সমিতিতে ভারতীয় সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। (৩) ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিয়ে একট যুদ্ধ উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন করা হবে। (৪) যুদ্ধান্তে ভারতের সংবিধান রচনার জন্য একটি গণপরিষদ গঠন করা হবে  এটি আগষ্ট ঘোষণা নামে  পরিচিত। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে বড়লাটের কার্যনির্বাহী
সমিতিতে সদস্য সংখ্যা ৭ থেকে বাড়িয়ে ১২ করা হয়  কিন্তু কংগ্রেস  বা মুসলিম লিগ যােগ দেয়নি। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লক দল আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ১৭ অক্টোবর গান্ধীজির নির্দেশে বিনােবা ভাবে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ শুরু করেন। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, রাজা গােপালাচারী সহ প্রায় ২৫০০ সত্যাগ্রহী কারা বরণ করেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে সত্যাগ্রহ আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি কর্তৃক রাশিয়া আক্রান্ত হলে কমিউনিস্ট পার্টি যুদ্ধ প্রচেষ্টার সামিল হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ জাপানের হাতে রেঙ্গুনের পতন হলে যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী চার্চিল মন্ত্রীসভার সদস্য আইনজ্ঞ স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে পাঠান। ২৩ মার্চ তিনি দিল্লী পৌছান ২৯ মার্চ ভারতের নেতৃবৃন্দের সামনে তিনি একটি প্রস্তাব রাখেন। এই প্রস্তাব ক্রিপস প্রস্তাব নামে পরিচিত। কংগ্রেস, শিখ, হিন্দু মহাসভা, ন্যাশনাল লিবারেল ফেডারেশন, ভারতীয় খ্রিস্টান ক্রিপস মিশনের বিরােধিতা করেন। মুসলিম লিগ ও মানবেন্দ্রনাথ রায়ে র‍্যাডিকেল ডেমােক্র্যাটিক পার্টি ক্রিপস মিশনকে স্বাগত জানায়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ৮ আগস্ট বােম্বাইয়ের নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে ভারতছাড়াে আন্দোলন-এর প্রস্তাব পাশ হয়। গান্ধীজি করেঙ্গে ইয়া  মরেঙ্গে’ বা ‘Do or Die’-এর ডাক দেন।  ৯ আগস্ট গান্ধীজি ও সরােজিনী নাইডুকে বন্দী করে আগা খান প্যালেসে রাখা হয়। কংগ্রেসকে বেআইনি ঘােষণা করে কংগ্রেসের অপর নেতাদের বন্দী করা হয়। গান্ধীজির উপর আন্দোলন প্রত্যাহারের চাপ
সৃষ্টি হয়। গান্ধীজি অনশন আন্দোলন করেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রতি-সরকার ও সমান্তরাল সরকার গড়ে ওঠে। বােম্বাইয়ে অরুণা আসফ আলি ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মিছিলে ৪ জন মারা যান ও ১৬৯ জন আহত হন। সাতারাতে প্রতি-সরকার গড়ে ওঠে ওয়াই. বি. চৌহান ও নানা পাতিলের নেতৃত্বে মদন ঝা বিহারে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। উত্তরপ্রদেশের বালিয়াতে চিতু পান্ডে একটি সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে বলেন স্বরাজ তহশিলদার। উড়িষ্যার বালাশারে স্বরাজ পঞ্চায়েত গঠিত হয় এবং উড়িষ্যাতে রক্ষা বাহিনী গঠিত হয়। উড়িষ্যার লক্ষ্মণ নায়েক নামে কংগ্রেস নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আসামে শান্তি সেনাবাহিনী নিয়ােগ করা হয়। মেদিনীপুরের তমলুকে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তার সর্বাধিনায়ক ছিলেন সতীশচন্দ্র সামন্ত ও তার দুই বিশিষ্ট অনুগামী অজয় মুখার্জি ও সুশীল ধাড়া সুতাহাটা, নন্দীগ্রাম, মহিষাদল ও তমলুক এই চারটি থানা ছিল জাতীয় সরকারের অধীন। তমলুক, নন্দীগ্রাম ও মহিষাদলে বিদ্যুৎবাহিনী বা জাতীয় বাহিনীর প্রতিষ্ঠা হয়। ৭৩ বছরের
তমলুকের হােগলা গ্রামের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা মিছিল পরিচালনা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তিনি পরিচিত গান্ধী বুড়ি’ নামে। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ১৭ ডিসেম্বর ১৯৪২ থেকে ১সেপ্টেম্বর ১৯৪৪ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে শাসন করে। ভারতের অন্যান্য বিখ্যাত নেতাদের মধ্যে ছিলেন অচ্যুত পট্টবর্ধন, অরুণা আসফ আলি, রামমনােহর লােহিয়া, বিজু পট্টনায়ক, সুচেতা কৃপলনী, গােপীনাথ বরদলি-শাদিক আলি, জয়প্রকাশ নারায়ণ, ছােটুভাই, আর পি. গােয়েঙ্কা, নরেন্দ্র দেব, যােগেশ চ্যাটার্জি, উষা মেটা, চন্দ্রকান্ত জাবেরি,  বাবুবাই, দয়াভাই প্যাটেল, বিঠল দাস প্রমুখ। নারীদের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিলেন আসামের ১৩ বছরের কিশােরী কনকলতা বড়ুয়া, পাঞ্জাবের গৃহবধূ ভােগেশ্বরী ফুকননী প্রমুখ।

Advertisements
Advertisements
Button
WhatsApp Group Join Now
Telegram Group Join Now
Instagram Group Join Now